আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরাক গত মাসে (এপ্রিল, ২০২৬) কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। ইরাকের নবনিযুক্ত তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দেশের তেল রপ্তানির এই সর্বশেষ ইতিবাচক ও বৈশ্বিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং সংবেদনশীল রুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই রুট ব্যবহার করে ইরাকের এই বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আধিপত্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ বলেন:
ওপেক-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা: ইরাক তার তেল উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা আরও বাড়ানোর জন্য তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক (OPEC)-এর সঙ্গে আলোচনা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছে।
ওপেক প্লাস জোট: বিশ্ববাজারে ইরাকের অংশীদারিত্ব বাড়াতে ওপেক প্লাস (OPEC+) জোটের নীতিমালার সঙ্গে সম্পূর্ণ সমন্বয় ও কোটা রক্ষা করে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
দৈনিক উৎপাদনের নতুন লক্ষ্য: তেলমন্ত্রী জানান, বাগদাদ বর্তমানে তাদের দৈনিক তেল উৎপাদনের ক্ষমতা ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) ব্যারেলে উন্নীত করার একটি বড় এবং উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করতে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইরাকের এই বিশাল তেল রপ্তানি এবং দৈনিক উৎপাদন ৫০ লাখ ব্যারেলে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের তেল রাজনীতি ও হরমুজ প্রণালির ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও অ্যাংলো-পার্সিয়ান ওয়েল (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে ইরাক বা মধ্যপ্রাচ্যে তেলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব আজকের মতো ছিল না। ১৯০৮ সালে ইরানে প্রথম তেল আবিষ্কার এবং পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে ইরাকের কিরকুকে বিশাল তেলের খনি পাওয়ার পর পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি বদলে যায়। ১৯০০ সালের সেই আদিম ও ব্রিটিশ-ফরাসি নিয়ন্ত্রিত তেল ক্ষেত্র থেকে ২০২৬ সালের এই সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তেল উৎপাদনকারী ইরাকের রূপান্তর এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস।
ওপেক-এর প্রতিষ্ঠা ও তেলের অস্ত্র (১৯৬০-১৯৯০): ১৯৬০ সালে বাগদাদ সম্মেলনের মাধ্যমেই ইরাকসহ ৫টি দেশ মিলে 'ওপেক' প্রতিষ্ঠা করে, যা ১৯০০ সালের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পশ্চিমাদের একক আধিপত্যের অবসান ঘটায়। সত্তর ও আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং পারস্য উপসাগরীয় সংকটের সময় এই হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
২০০৩ সালের মার্কিন আক্রমণ থেকে ২০২৬-এর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা: ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকের তেল উৎপাদন ব্যবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের পর থেকে ইরাক তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ২০ extraction২৬ সালের এই মে মাসে এসে ইরাকের দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রমাণ করে যে, দেশটি এখন মার্কিন বা বিদেশি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে নিজের জ্বালানি খাতকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
ডিজিটাল ও গ্রিন এনার্জির যুগে তেলের রাজনীতি: ১৯০০ সালের কয়লাভিত্তিক বিশ্ব থেকে ২০২৬ সালের এই নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Green Energy) ও বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) যুগে পৌঁছেও অপরিশোধিত তেলের গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। ২০২৬ সালের এই মে মাসের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরাকের ১ কোটি ব্যারেল তেল পারাপার প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের চাবিকাঠি এখনো এই সংকীর্ণ জলপথের হাতেই বন্দি।
ইতিহাস সাক্ষী, মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধি ও সংঘাত—দুটিই আবর্তিত হয়েছে কালো সোনা বা তেলের ওপর ভিত্তি করে। ১৯০০ সালের সেই অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ইরাক থেকে ২০২৬ সালের এই স্বাধীন তেল পরাশক্তি ইরাক—ইতিহাসের চাকা অনেক দূর গড়িয়েছে। ওপেক প্লাসের নীতিমালার মধ্যে থেকে ইরাক যেভাবে তাদের উৎপাদন ৫০ লাখ ব্যারেলে নিয়ে যাওয়ার ছক কষছে, তা আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ইরাকের এই অর্থনৈতিক স্বপ্ন যেকোনো সময় আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: ১. বাগদাদে ইরাকের তেল মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য (মে ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীতে ওপেক-এর ইতিহাস এবং পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |